কাতারের প্রস্তাবে নতুন যুগে এয়ার ফোর্স ওয়ান, কিন্তু ভেতরে কেমন এটি?
May 19, 2025, 4:13 PM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সফরসঙ্গী অধিকাংশ সাংবাদিকই উড়োজাহাজ ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর ভেতরের অংশের নির্দিষ্ট অংশের বাইরে দেখার সুযোগ পান না।
প্রেসিডেন্টের এই বিশেষ উড়োজাহাজে সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত অংশটি থাকে পেছনের দিকে। সেখানে পৌঁছাতে হয় উড়োজাহাজের পেছনের সিঁড়ি বেয়ে, এক কোণ ঘুরে।
উড়োজাহাজের সামনের দিকে থাকা প্রেসিডেন্টের কেবিনে যেতে পার হতে হয় পাশের কেবিনে অবস্থানরত সশস্ত্র সিক্রেট সার্ভিস এজেন্টদের নিরাপত্তা বলয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যে সফরের সময় ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। তখন ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটি মাঝআকাশেই প্রেসিডেন্টের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। তার আসনটি ছিল অন্য সাংবাদিকদের তুলনায় ভিন্ন জায়গায়।
মধ্যপ্রাচ্য সফরটি ছিল বেশ গতিশীল ও ব্যস্ততায় পরিপূর্ণ। তিন রাতেই তিনটি ভিন্ন দেশে থাকতে হয়েছিল, বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরতে হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এই সফরকে বলেছেন একটি “সহনশক্তির পরীক্ষা”—যা কেবল তার দল নয়, সফরসঙ্গী সাংবাদিকদেরও দিতে হয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্টের এই বিশেষ উড়োজাহাজ দিয়ে ভ্রমণ করাটা মোটেই খারাপ অভিজ্ঞতা নয়। সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত ১৪টি আসন ছিল আরামদায়ক, প্রায় ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির বিমানের আসনের মতো।
উড়োজাহাজে একটি বাথরুম রয়েছে। আর একটি ছোট টেবিল রয়েছে নানান খাবারদাবারে সাজানো। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম আকর্ষণীয় ছিল ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর নিজস্ব ব্র্যান্ডের এমঅ্যান্ডএম চকলেট। এতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর থাকে। আর এটি অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
সাংবাদিকদের অংশে দুটো টেলিভিশন মনিটর থাকে। সাধারণত সেখানে প্রেসিডেন্টের পছন্দের ক্যাবল নিউজ চ্যানেল চালানো হয়। যেমন জো বাইডেনের সময় সিএনএন ও ট্রাম্পের সময় ফক্স নিউজ। কখনও কখনও ফুটবল খেলা বা অন্য কোনও অনুষ্ঠানও দেখানো হয়।
দীর্ঘ ভ্রমণের সময় উড়োজাহাজে থাকা রান্নাঘর থেকে প্লেট করে খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে প্রেসিডেন্টের জন্য থাকে আলাদা ও বেশি বিলাসবহুল খাবারের ব্যবস্থা। সংক্ষিপ্ত ভ্রমণে খাবার সাধারণত প্যাকেটে দেওয়া হয়।
এই ঐতিহাসিক উড়োজাহাজের অভ্যন্তরীণ অংশ অচিরেই বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে। এমনকি সম্ভাবনা রয়েছে এর জায়গায় নতুন একটি ‘আকাশের রাজপ্রাসাদ’ আসার—যা কাতারের পক্ষ থেকে ট্রাম্পকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি গ্রহণ করলে সেটিই হবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও প্রেসিডেন্টের পাওয়া সবচেয়ে বড় বিদেশি উপহার।
টেকনিক্যালি “এয়ার ফোর্স ওয়ান” মূলত একটি রেডিও সংকেতের নাম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যখন উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেন তখন এই সংকেত ব্যবহার করা হয়। এমনকি ১৯৬০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন যখন অস্টিন থেকে টেক্সাসের খামারে ছোট একটি প্রপেলর বিমানে গিয়েছিলেন, সেটিও তখন এয়ার ফোর্স ওয়ান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।
তবে অধিকাংশ মানুষের কল্পনায় যে উড়োজাহাজটি “এয়ার ফোর্স ওয়ান” হিসেবে ভেসে ওঠে, সেটি হলো বোয়িং ৭৪৭-২০০বি। এর গায়ে পান্না নীল, স্টিলি নীল ও সাদা রঙের সমন্বয়ে একটি রুচিশীল রঙের স্কিম রয়েছে, যা প্রথম ফার্স্ট লেডি জ্যাকি কেনেডি ১৯৬২ সালে নির্বাচন করেছিলেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর বহরে এমন দুটি বোয়িং ৭৪৭ রয়েছে, যেগুলো ১৯৯০ সাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তি ও উড়োজাহাজের ডিজাইনে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এই উড়োজাহাজ দুটি কিছুটা আপগ্রেড করা হয়েছে। এতে কাঠামো ও ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দিন দিন বাড়ছে। ফলে উড়োজাহাজের বয়স বেশ স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে।
এই বিষয়টি বর্তমান প্রেসিডেন্টের কাছে বেশ বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। তিনিই একমাত্র প্রেসিডেন্ট, যিনি দায়িত্ব গ্রহণের আগে নিজস্ব একটি উড়োজাহাজ ও এমনকি একটি উড়োজাহাজ সংস্থার মালিক ছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার আবুধাবিতে একটি শিল্প সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছিলেন, “আমি এখন একটি ৪২ বছর পুরনো বোয়িংয়ে চড়ি। তবে নতুন বিমান আসছে।” তিনি বোয়িংয়ের বয়সটা কিছুটা বাড়িয়ে বলেছেন।
ট্রাম্পের কাছে এই নতুন উড়োজাহাজ আসার প্রক্রিয়া খুব ধীর মনে হচ্ছে। তার প্রথম মেয়াদকালেই তিনি বোয়িংয়ের তৈরি একটি নতুন উড়োজাহাজের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। এমনকি তিনি নিজের পছন্দমতো নতুন রঙের ডিজাইন বেছে নিয়েছিলেন, যা জ্যাকি কেনেডির ঐতিহ্যবাহী রঙের জায়গায় ছিল লাল-সাদা-নীল। তিনি ওভাল অফিসে নতুন ডিজাইনের সেই উড়োজাহাজের একটি মডেল প্রদর্শন করে গর্বও করেছিলেন।
প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, নতুন উড়োজাহাজ দুটি ২০২১ সালের মধ্যেই সরবরাহ করা হবে। কিন্তু প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের নির্মাণ প্রকল্পে দেরি ও খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে এখন মনে করা হচ্ছে, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বেশির ভাগ সময়েও এই দুটি নতুন উড়োজাহাজ ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে না। তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হবে জানুয়ারি ২০২৯ সালে।
এই কারণে ট্রাম্প প্রযুক্তি খাতে বিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ককে নির্দেশ দিয়েছেন কাজের গতি বাড়ানোর জন্য। ব্যক্তিগতভাবে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, এত পুরনো একটি উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতে গিয়ে তিনি বিব্রত বোধ করেন।
আর এজন্যই প্রেসিডেন্ট হঠাৎ কাতারের প্রস্তাবিত একটি সহজ ও দ্রুত সমাধানের দিকে ঝুঁকেছেন। কারণ এটি তার আকাশপথের সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হয়ে উঠতে পারে।
গত সপ্তাহে কাতারের দেওয়া বিলাসবহুল ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ উপহারের খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়। কিন্তু বাস্তবে এই উপহারের বিষয়টি গত কয়েক মাস ধরেই পরিকল্পনায় ছিল।
ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুর কয়েক সপ্তাহ পরই গোপনে এই বিমানটি পরিদর্শন করেছেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে।
তবে এত বড় একটি উপহার গ্রহণ নিয়ে আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকরা এবং প্রেসিডেন্টের কিছু ঘনিষ্ঠ সহযোগীও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি একটি বিদেশি ৭৪৭ উড়োজাহাজকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করতে গেলে অনেক ধরনের কারিগরি চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়।
এই উড়োজাহাজে মাঝআকাশে জ্বালানি নেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং উন্নতমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম সংযোজন করতে হবে। বর্তমান এয়ার ফোর্স ওয়ান উড়োজাহাজ এমনভাবে নির্মিত, যাতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালসেও সেগুলো সচল থাকে।
এই ধরনের রিফিটিং বা পুনর্গঠনের কাজ সম্পূর্ণ হতে বহু বছর সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন অ্যারোডায়নামিক অ্যাডভাইজরি নামক সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উড়োজাহাজ বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়া। তার মতে, এই কাজ শেষ হতে অন্তত ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, “ধরে নিতে হবে উড়োজাহাজটি গত ১৩ বছর ধরে একটি অনিরাপদ জায়গায় পড়ে আছে। তাই শুধু উড়োজাহাজটিকে খুলে দেখা যথেষ্ট নয়, এর প্রতিটি যন্ত্রাংশ আলাদা করে খতিয়ে দেখতে হবে।”
এই উড়োজাহাজে নতুন সিস্টেম চালানোর জন্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া ভেতরের সাজসজ্জাও পরিবর্তন করতে হতে পারে। অনুমান করা যাচ্ছে, এই বিলাসবহুল উড়োজাহাজে শুরুতে সাংবাদিকদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট কেবিন রাখা হয়নি।