বৈঠক হলো, তবে সবাই যার যার অবস্থানেই
May 25, 2025, 2:50 PM
রাজনীতির মাঠে আকস্মিক উত্তাপের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক শুরু করলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
প্রথম দফায় বৃহস্পতিবার বিএনপি, জামায়াতে ইসলাম ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। তবে যার সূত্র ধরে এই উত্তাপ দলগুলোর আলোচনায় তা প্রশমনের কোনও ইঙ্গিত মেলেনি।
বিএনপি ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসার পাশাপাশি উপদেষ্টা পরিষদ থেকে মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে বাদ দেওয়ার কথাই বলে এসেছে।
অন্যদিকে অভ্যুত্থানকারীদের গড়া দল এসিপি ‘অভ্যুত্থানের সরকারের’ প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে এসেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচনের কথা বলে এসেছে তারা।
মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে জামায়াত বলে এসেছে, সংস্কার ছাড়া নির্বাচন যেমন জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। তবে নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ দরকার।
এই দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন প্রশ্নে আগের অবস্থানই জানিয়েছেন ড. ইউনূস। তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বৈঠক পরবর্তী প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচনের কথাই আবার তুলে ধরেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় দলগুলোর সঙ্গে আলাদা আলাদা বৈঠকে ড. ইউনূসের সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ ও স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া ছিলেন।
যার অর্থ আসিফ মাহমুদকে বাদ দেওয়ার দাবি তার সামনেই জানিয়ে এলেন বিএনপির প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের বছর পূর্তির দুই মাস আগে অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভেদের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ড. ইউনূসের পদত্যাগের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
নির্বাচনের সময়, সংসদ নির্বাচন আগে নাকি স্থানীয় নির্বাচন আগে, সংস্কার কতটা হবে, মিয়ানমার সীমান্তে করিডোর প্রতিষ্ঠা হবে কি না, এই সব নিয়ে বিরোধ চলছে সরকারের সমর্থক দল এনসিপির সঙ্গে বিএনপির মধ্যে।
পদত্যাগের গুঞ্জন শুনে বৃহস্পতিবার ড. ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে যান সাবেক উপদেষ্টা ও বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এরপর তিনি জানান, সার্বি পরিস্থিতিতে অসন্তুষ্ঠ ড. ইউনূস পদত্যাগের কথা ভাবছেন।
তা নিয়ে তুমুল আলোচনা ও জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে শনিবার পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, ইউনূস তার পদে থাকছেন।
এদিন উপদেষ্টা পরিষদ এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের পর একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে তাদের কাজে যদি অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তির ইন্ধনে কিংবা বিদেশি শক্তির দ্বারা বাধা সৃষ্টি করা হয়, তবে জনগণকে নিয়ে তা মোকাবেলা করা হবে।
এরপর রাতেই পরপর তিনটি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন ড. ইউনূস।
৩ জনের পদত্যাগের দাবি বিএনপির
স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির চার সদস্যের প্রতিনিধি দল যায় যমুনায়। বাকি তিনজন হলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বৈঠক শেষে সালাহউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার স্বার্থে বিতর্কিত উপদেষ্টাদের বাদ দিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা এবং এই দাবি লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং দুজন ছাত্র উপদেষ্টার কারণে এই সরকারের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে, তাদের বাদ দেওয়ার জন্য আজকেও লিখিত বক্তব্য দিয়েছি, মুখেও বলেছি।”
ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে শপথ না পড়ানোর পেছনে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ ও তথ্য উপদেষ্টার হাত রয়েছে বলে বিএনপির দাবি।
যমুনা ঘেরাও করে ইশরাক সমর্থকদের টানা বিক্ষোভ থেকে দুই ছাত্র উপদেষ্টাকে বাদ দেওয়ার দাবি ওঠার পর গত বৃহস্পতিবার বিএনপি সংবাদ সম্মেলন করে এই দাবি জানায়। এর মধ্যে নিজের নাগরিকত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তারেক রহমানের বিদেশে থাকার প্রসঙ্গ টানায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে সরানোর দাবিও তোলে বিএনপি।
তাদের তিনজনকে সরানোর বিষয়ে কোনও আশ্বাস পেয়েছেন কি না- এই প্রশ্নে সালাহউদ্দিন বলেন, “তারা দেখবেন। আমরা আমাদের বক্তব্য দিয়েছি।”
বিএনপি বৃহস্পতিবারের সংবাদ সম্মেলনে হুমকি দিয়েছিল, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের তারিখ ঠিক করে রোডম্যাপ দেওয়া না হলে তারা অন্তর্বর্তী সরকারকে সহায়তা করবে না।
বৈঠকে নির্বাচনের রোডম্যাপের আশ্বাস পেয়েছেন কি না- সাংবাদিকরা জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন বলেন, “সুনির্দিষ্টভাবে এমন কোনও কথা হয়নি। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে জানাননি। আমরা আমাদের দাবি জানিয়েছি। হয়তোবা তারা তাদের প্রেস উইংয়ের মাধ্যমে জানাবেন।”
তবে বৈঠক শেষে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল নির্বাচন নিয়ে আগের কথাই বলেন। অর্থাৎ ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন হবে।
বিএনপির প্রতিনিধি দলের সদস্য আমীর খসরু সাংবাদিকদের বলেন, “সংস্কারের বিষয়ে আমরা পরিষ্কার এবং তারা একমত হয়েছেন। সংস্কার যেখানে ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়ার কথা, তার ভিত্তিতে সংস্কারকাজ সম্পন্ন হবে এবং সেই কাজ অতি সহসা সম্পন্ন করা সম্ভব। এখানে কোনও দ্বিমত পোষণ করেননি। বিচারব্যবস্থা বিচার বিভাগ করবে এবং বিচারের আওতায় আনার ব্যাপারে যে আলোচনা হয়েছে, এখানেও তাদের কোনও দ্বিমত নেই।”
বৈঠকের পর লিখিত বক্তব্যে খন্দকার মোশাররফ বলেন, “যেকোনও উছিলায় নির্বাচন যত বিলম্ব করা হবে, আমরা মনে করি, জাতির কাছে আবার স্বৈরাচার পুনরায় ফিরে আসার ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। এর দায়দায়িত্ব বর্তমান সরকার এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ওপরে বর্তাবে।”
বিএনপির প্রতিনিধি দলের প্রধান বলেন, তারা কখনোই প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগ চাননি, বরং প্রথম দিন থেকেই এই সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে যাচ্ছে বিএনপি।
স্থানীয় নির্বাচন আগে চায় এনসিপি
বৈঠকে এনসিপির চার সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন দলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা।
বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচন আগে আয়োজনের দাবি জানিয়ে আসে এনসিপি, যা নিয়ে বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের রয়েছে প্রবল আপত্তি।
বৈঠক শেষে নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, তারা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন চাইছেন, কারণ তাদের মতে এই কমিশন আস্থা হারিয়েছে। ইসি পুনর্গঠন করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন যাতে দ্রুত আয়োজন করা হয়, তা প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছেন তারা।
যা নিয়ে বিরোধ গভীর হয়েছে, সেই ইশরাকের নির্বাচনের প্রসঙ্গ উল্লেখ না করলেও নাহিদ বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো অবৈধ ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন তারা।
“শেখ হাসিনার আমলের নির্বাচনগুলো প্রশ্নবিদ্ধ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো তখন এসব নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছিল। সেই নির্বাচনগুলোকে আবার আদালতে নিয়ে গিয়ে এক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে। সেই বিশৃঙ্খলা এড়াতে সেই আগের নির্বাচনগুলোকে যেন আইনগতভাবে অবৈধ ঘোষণা যাতে করা হয়।”
জুলাই গণহত্যার বিচার, জুলাই সনদ এবং গণপরিষদ ও আইন সভা নির্বাচনের সমন্বিত রোডম্যাপ একত্রে ঘোষণার দাবি জানান নাহিদ।
গণঅভ্যুত্থানের যে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন, তা শেষ করতে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে এনসিপি।
নাহিদ বলেন, কোনও রাজনৈতিক দল নয়, জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতেও তারা প্রধান উপদেষ্টাকে অনুরোধ করেছেন। তার সরকারের প্রতি সমর্থনও জানিয়েছেন।
জামায়াতের ২ দাবি
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে গিয়েছিলেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এবং নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
বৈঠক শেষে শফিকুর সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা বলেছি, দুইটা বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার। নির্বাচনটা কখন হবে? আপনি যে সময়সীমা দিয়েছেন, এর ভেতরে জনগণের কোনও বড় ধরনের ভোগান্তি না হয়ে একটা কমফোর্টেবল টাইমে নির্বাচন হওয়া উচিৎ।
“দুই নম্বর হলো, নির্বাচনের আগে সংস্কার ও দৃশ্যমান বিচারের কিছু প্রক্রিয়া জনগণের সামনে আসতে হবে। সংস্কার শেষ না করে যদি নির্বাচন হয়, জনগণ এই নির্বাচনে তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না। আবার সব সংস্কার এই সরকারের পক্ষে করা সম্ভবও নয়।”
বিএনপির মতো জামায়াত কোনও সময় বেঁধে দেয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা কমফোর্টেবল দুইটা টাইম জাতিকে জানিয়েছি। যদি সংস্কার শেষ হয়, তাহলে ফেব্রুয়ারির মধ্যভাগে এটা (নির্বাচন) হতে পারে। আর যদি আরেকটু সময় লাগে, তাহলে রোজার পরপর হতে হবে। তবে তারপর এটাকে টেনে লম্বা করলে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে না।”
প্রধান উপদেষ্টা কী বলেছেন- জানতে চাইলে শফিকুর বলেন, “উনি শুধু এটুকুই বলেছেন- দেশ আমাদের সবার, আমি অবশ্যই একটি অর্থবহ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন দিতে চাই, আমি যেন-তেন কোনও নির্বাচন দিতে চাই না।”
বিএনপির মতো কোনও উপদেষ্টার পদত্যাগ চায়নি জামায়াত। এ বিষয়ে জামায়াতের অবস্থান জানতে চাইলে শফিকুর বলেন, “পদত্যাগ চাইলো বিএনপি, আর ফতোয়া দেবে জামায়াতে ইসলামী? এটা কি মানায়? যারা পদত্যাগ চেয়েছে, তারাই ব্যাখ্যা করবে। আমরা কারও কোনও পদত্যাগ চাইনি।”